নিজেকে 'রিপিট' করার ভয় আমাকে তাড়া করে বেড়ায়: ঋত্বিক চক্রবর্তী


অতনু রায়: একের পর এক অন্য ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি মন জয় করেছেন দর্শকদের। সবেমাত্র তিনি পা রেখেছেন ওটিটি মাধ্যমে। কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছে তাঁর প্রথম ওয়েব সিরিজ 'গোরা'। এবার জি-ফাইভে আসছে তাঁর দ্বিতীয় ওয়েব সিরিজ 'মুক্তি'। 'মুক্তি' মুক্তির আগে ঋত্বিক চক্রবর্তী ধরা দিলেন খোলামনে।

প্রশ্ন: অভিনেতা ঋত্বিকের কাছে 'মুক্তি' মানে কি?

ঋত্বিক: 'মুক্তি' কি সেটা বলা তো খুব মুশকিল। তুমি যদি অভিধান দেখো, সেখানে বলছে পুনঃ পুনঃ জন্মলাভের থেকে বিরতি। আমি তো সবকিছুর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে থাকি তাই সেভাবে দেখলে আমি কিন্তু মুক্তি খুঁজিও না।


প্রশ্ন: আর জন্মলাভের কথাই যদি বল, প্রত্যেকটা চরিত্রই তো তোমার আলাদা আলাদা এক একটা জন্ম বলা যেতে পারে?

ঋত্বিক: জন্ম ঠিক বলব না। তবে হ্যাঁ, অভিনেতাদের একটা মজা আছে। কাজ করতে করতে অনেকগুলো জীবন তো আমরা বেঁচেই ফেলি।


প্রশ্ন: এত কাজের মধ্যে নিজেকে নতুন করে গড়ার সময় পাও?

ঋত্বিক: দেখো, এটা তো একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাঝখানে কোভিডের কারণে আমরা একটা বিরতি পেয়েছিলাম। বাড়িতে বিভিন্নভাবে আটকে গিয়েছিলাম আমরা। ফলে অন্তর্মুখী হওয়ার একটা সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। নিজের দিকে তাকানোর, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর একটা সুযোগ পেয়েছিলাম। কোভিডের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মাঝেও সেটা একটা খুব পজিটিভ দিক বলে আমার মনে হয়। নিজের সঙ্গে কাটানো সময়টা হয়তো সমস্ত ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে।


প্রশ্ন: অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী কিভাবে প্রস্তুতি নেয়?

ঋত্বিক: সেরকম কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম আমার অন্তত নেই। দিনের শেষে সব চরিত্রই যেহেতু তার নিজের মতো করে আলাদা তাই আলাদা রকমের প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। কোনো কোনো চরিত্র করতে একটু বেশি প্রস্তুত হতে হয়। এইকারণে নয় যে, চরিত্রটা খুব কঠিন। হয়তো কোনও একটা চরিত্রে এমন কিছু আছে যেটা আমার অজানা। হয়ত এমন কিছু একটা করতে হবে যেটা ব্যক্তি ঋত্বিক জানেনা। তখন সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একটু বেশি অনুশীলন করতে হয়। তবে সব চরিত্রের জন্যই কমবেশি একটা প্রস্তুতি তো লাগেই।


প্রশ্ন: ছোটবেলায় যখন প্রথমবার 'শোলে' দেখেছিলাম সেই সময় থেকেই একটা সংলাপ কানে লেগে আছে; "হম্ আংরেজো কে জমানে কা জেলার হ্যায়"। রামকিঙ্করের তো একদম সেই জুতোতেই পা?

ঋত্বিক: 'আংরেজো কে জমানে কা জেলার'ই বটে। সেই জুতোতেই পা বলা চলে। রামকিঙ্কর ইংরেজ আমলের একজন চাকুরিজীবি যার কাছে চাকরিটার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির যে চাকরিপ্রিয়তা, রামকিঙ্করও তার বাইরে নয়। এরকম একটা চাকরি করতে গেলে ব্রিটিশদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতের মিলও থাকতে হয়। না হলে সে কাজটা করে উঠতে পারবে না। রামকিঙ্কর যেহেতু কর্তব্যনিষ্ঠ তাই সে ব্রিটিশদের সঙ্গেই আছে। কিন্তু সে আলাদা আলাদা মত আর পথও দেখতে পায়। আর মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল। রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক সব ধরনের বন্দিই থাকতেন সেখানে। 


প্রশ্ন: মানুষ তুলনা করতে খুব ভালোবাসেন। 'মুক্তি' ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই ফুটবল নিয়ে 'গোলন্দাজ'-এর সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে। কি বলবে?

ঋত্বিক: দেখো, কারো ফুটবলের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা যদি 'গোলন্দাজ' থেকে শুরু হয় তাহলে তার 'গোলন্দাজ' মনে হবে। আবার কারুর যদি অন্য রেফারেন্স থাকে তাহলে তার সেটা মনে হবে। কিন্তু আমি তো জানি যে, কাজটা কি। তাই আমি এসব নিয়ে আর রিয়্যাক্ট করিনা।


প্রশ্ন: আমরা যখন কোনও ইতিহাস পড়ি, মনে সেটার একটা দৃশ্যকল্প তৈরি হয়। তোমার পড়া ইতিহাসের সাথে কি কোথাও 'মুক্তি'র গল্পের চলনটা মিলে মিশে গেছে?

ঋত্বিক: হ্যাঁ। আমার মনে হয় সকলের কাছেই এটা মিলে মিশে যাবে। আমাদের প্রত্যেকেরই যে চিত্রকল্প সেটা ব্যক্তিবিশেষে আলাদা হয়। এখানে ইতিহাসটাকে খুব চমৎকারভাবে গল্পের সঙ্গে পরতে পরতে মেশানো আছে।আমার তো মিলে মিশে গেছে।


প্রশ্ন: প্রথমে 'গোরা', এবারে 'মুক্তি'। একেবারে গোরাদের থেকে মুক্তি। ফিচার ফিল্মের বাইরের জগতে পা রেখে কেমন অনুভূতি হল?

ঋত্বিক: একজন অভিনেতা হিসেবে আমার সেরকম আলাদা কিছু মনে হয়নি। ওয়েব সিরিজ যেহেতু চরিত্রকেন্দ্রিক, তাই চরিত্রটা অনেক বড় হয়। তবে মাধ্যমটা আলাদা বলে যারা লিখছেন বা বানাচ্ছেন তাদের দিক থেকে অনেকটাই আলাদা হয়। আর অভিনেতাকে খুঁটিনাটি ব্যাপারে অনেক বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু অভিনয়ের দিক থেকে আমার কোনো পার্থক্য মনে হয়নি।


প্রশ্ন: এক বছরে সবথেকে বেশি ছবি করলেও তোমার অভিনয় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এটা কি শুধুমাত্র তোমার কাছে ভালো চরিত্র আসছে বলে? নাকি স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য আলাদা হোমওয়ার্ক রয়েছে?

ঋত্বিক: (হেসে) না, ঠিক সেরকম নয়। আমিতো কোভিডের কারণে প্রায় দু'বছর কোনো কাজ করিনি। অনেকদিন পরে এই কাজটা করছি। কাজের মধ্যে বিরতি না থাকাটা আমাকে অভিনেতা হিসেবে খুবই চিন্তায় রাখে। অবশ্য এই চিন্তাটা সারাজীবন থাকলে আমার নিজের জন্যই ভালো। আসলে নিজেকে 'রিপিট' করে ফেলার একটা ভয় আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। তার প্রতিফলন আমার কাজে পড়ে কিনা জানিনা কিন্তু এই ভয়টা আমার হয়। আর ভয় যখন আছে তখন ভেতরে ভেতরে তার থেকে বেরোনোর পথও আমি খুঁজি। আমি এও জানি না সেটা খুঁজে পাই কিনা!


প্রশ্ন: তুমি প্রতিটা চরিত্রে নিজের একশো শতাংশ দাও। এত কাজের মাঝে কখনো পরিচালনার ইচ্ছে হয়নি?

ঋত্বিক: আসলে আমার মধ্যে কোনও পরিচালক সত্তা নেই। তাই পরিচালনার কথা আমার কখনোই মনে হয় না। কমবয়সে একটা রোমান্টিকতা থাকে, তখন মাঝেমধ্যে পরিচালনা করার ইচ্ছে হয়েছে বটে। তারপরে আর পরিচালক হওয়ার তাগিদ অনুভব করিনি।


প্রশ্ন: এত ছবিতে অভিনয় করেছ। আজও সেইভাবে তোমার লিপে কোনও তথাকথিত 'হিট' গান নেই। কোনও আক্ষেপ আছে?

ঋত্বিক: লিপে নেই, তবে আমার ছবির কিছু গান জনপ্রিয় হয়েছে। লিপে গান আমার কমই আছে। আর সেটা নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপও নেই গো। আসলে লিপে গান তথাকথিত কমার্শিয়াল ছবির ক্ষেত্রেই বেশি হয়। আমি শুরু থেকেই জানতাম যে আমি ওই ধরনের ছবিগুলো করব না। সেই জন্য সেরকম কোনও অভাববোধও আমার নেই। কখনো কখনো লিপে গান এসেছে এবং গানে লিপ দিয়ে খুব মজাও পেয়েছি। নিজের মজাটুকুই এক্ষেত্রে যথেষ্ট। 


প্রশ্ন: ওটিটি প্ল্যাটফর্মই কি ভালো কনটেন্ট-এর ভবিষ্যৎ?

ঋত্বিক: ওটিটি প্ল্যাটফর্মই একমাত্র ভবিষ্যৎ বলে আমার মনে হয় না। তবে ওটিটি অবশ্যই একটা বড় ভূমিকা নেবে। হয়তো সিনেমার জমিও খানিকটা দখল করে নেবে। আমার মনে হয়, এখন এই জ্যোতিষী-জ্যোতিষী খেলাটারও কোনও দরকার নেই। একটু অপেক্ষা করলেই সব দেখতে পাব। তবে মনে তো হচ্ছে ওটিটি দ্রুত এগিয়ে আসছে। বড় বড় স্টারের ছবি যখন ওটিটিতে রিলিজ হচ্ছে তখন তো মনে হচ্ছে এটা অনেকটা জায়গা নিয়ে নেবে।


প্রশ্ন: এখন তো অনেক ছবিও সরাসরি ওটিটিতে মুক্তি পাচ্ছে। তুমি কি মনে কর যে সিনেমা শুধুমাত্র বড়পর্দার জন্য?

ঋত্বিক: সেরকম যে মনে করি সেটা নয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় পর্দায় ছবি দেখার একটা গুরুত্ব থেকেই যাবে। আমরা এখন একটা অন্যরকম সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা এই সময়টার সঙ্গে আরো পাঁচ-সাত বছর থাকলে নিজেরাই বুঝতে পারব যে এটা কিরকম আকার নিচ্ছে। কারণ, এটা কিন্তু রোজ বদলাতে বদলাতে যাচ্ছে। ওটিটি কনটেন্ট বেসড্ প্ল্যাটফর্ম, তাই বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে কাজ হবে। অভিনেতাদের জন্যও খুব ভালো হবে। তারা বিভিন্ন রকমের কনটেন্টে কাজ করতে পারবেন।


প্রশ্ন: ঋত্বিক চক্রবর্তী 'কিউবা' হলে ক্রিস্টোফার কলম্বাস কে? কে খুঁজে বার করল অভিনেতা ঋত্বিক কে?

ঋত্বিক: এই প্রশ্নের উত্তরটা সাংঘাতিক ধাঁধার মত। তবে কি বলতো, আমি না সত্যিই জানিনা। আমাকে যদি কেউ সত্যিই খুঁজে পেত তাহলে তো আমাকে এত আপ্রাণ চেষ্টা করে কাজ পেতে হত না। কে আমাকে খুঁজে পেল বা কোনো একটি মানুষই আমাকে খুঁজে পেল কিনা সেটাও আমি জানি না। তবে আমার প্রত্যেকটা কাজ আমার নিজের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। প্রত্যেকটা ছবি অল্প অল্প করে আমার পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা, আমার সম্পর্কে পরিচালকদের বিশ্বাস তৈরি করেছে। কারণ, আমাকে সবসময় পরিচালকেরা কাস্ট করেছেন। এক ধরণের অভিনেতা থাকেন যাদেরকে প্রযোজকেরা কাস্ট করেন, কিন্তু আমাকে সবসময় পরিচালকেরা কাস্ট করেছেন।


প্রশ্ন: এটা কি তোমার প্রথম ছবি থেকেই হয়েছে?

ঋত্বিক: হ্যাঁ, বলতে পারো। প্রযোজকের একটা সম্মতি তো লাগেই কিন্তু আমাকে প্রথম থেকে পরিচালকেরাই কাস্ট করেছেন। আসলে আমাকে তো কেউ চিনত না। আমাকে পরিচালকেরাই চিনত। প্রযোজকদের চেনার মত জায়গায় আমি ছিলামও না। আমি টেলিভিশনে অভিনয় করতাম, তাই প্রযোজকদের চেনার কথা ছিল না।


প্রশ্ন: এত কাজের ব্যস্ততার মধ্যে নতুন করে যদি আবার টেলিভিশনে কাজের অফার পাও, করবে?

ঋত্বিক: টেলিভিশনে তো এখন অনেক অন্যরকমের কাজও হচ্ছে। তেমন অফার পেলে হয়ত করব। কিন্তু এখন মেগাসিরিয়াল করতে বললে সেটা করব না।